ছেলেবেলায় বইয়ে পড়েছি ময়নামতি শালবন বিহারের নাম। সেই থেকে দেখার অদম্য ইচ্ছা। ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কের মাঝামাঝি কুমিল্লায় কতবার গাড়ি থেমেছে, কিন্তু ওই হোটেলে খাওয়া আর ফ্রেশ হওয়া পর্যন্তই। কিন্তু ভ্রমণপিয়াসী মন এবার আর বন্ধু অনজন দাশের ডাক উপেক্ষা করতে পারলাম না। অফিস ছুটির দিনে তাই বেরিয়ে পড়লাম কুমিল্লার উদ্দেশ্যে। পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডে নামলাম গাড়ি থেকে।
এরপর বন্ধুর বাসা। যেহেতু বিকালের দিকে গিয়েছি তাই সিদ্ধান্ত হল সেদিন রাতে ঘুরে ঘুরে আলো ঝলমলে, জনসংখ্যার চাপ বাড়াতে কিছুটা অগোছালো হয়ে ওঠা শহরটা দেখলাম। টাউন হল, জেলা স্কুল, কান্দির পাড়।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাতের ক্যাম্পাস আর সবশেষ আড্ডা হল ফরেস্ট বাংলোয়। একেবারে গ্রামীণ পরিবেশ, চারদিকে গাছগাছালি। ঝিঁঝির ডাক। কেমন একটা ঘোর লাগা সময়। রাতে ধর্মসাগরও দেখলাম। ঢুকতেই একটা মিষ্টি মাতাল হাওয়া গা ছুঁয়ে যাচ্ছিল। বিশাল জলরাশি দেখতে সিদ্ধান্ত নিলাম পরদিন কুমিল্লা ভ্রমণটা শুরু হবে ধর্মসাগর দিয়েই।
সকালে নন্দন উদ্যানে নামতেই চারদিকে কলরব। ততক্ষণে জমে উঠেছে। কুলির হাঁকডাক, দোকানিদের তাড়া আর স্কুল পালানো ছেলেমেয়েদের উচ্ছ্বাস। আর মাত্র কয়েক কদম এগিয়ে যেতেই দৃষ্টিসীমার মধ্যে চলে এলো বিশাল জলরাশি। আহা, ধর্মসাগর! নামের সঙ্গে ‘সাগর’ থাকলেও ধর্মসাগর কিন্তু সাগর নয়। বিশাল দীঘি। সাগরের মতো উত্তাল ঢেউ নেই এখানে, তবে এর বাতাসে মৃদু ধ্বনি রয়েছে।
১৪৫৮ সালে ত্রিপুরার মহারাজা ধর্মমাণিক্য স্থানীয় মানুষকে পানির সুবিধা দিতে খনন করেন এই দীঘি। তার নামানুসারেই এর নাম ধর্মসাগর। এখন হয়তো সেটি আর মানুষের তৃষ্ণা মেটায় না। কিন্তু মনের তৃষ্ণা মিটিয়ে যাচ্ছে সৃষ্টি থেকে আজ অবধি। শচীন দেববর্মন আর কাজী নজরুল ইসলামের ভাবুক মনের স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই ধর্মসাগর পারকে ঘিরে। একসঙ্গে দু’জনের অনেক সময় কেটেছে এখানে।
দীঘির উত্তরপারে টিলার ওপর রয়েছে রানীর কুঠির। ধর্মসাগরে কয়েকটি নৌকা রয়েছে যাতে করে ভ্রমণবিলাসী মানুষ নৌকায় চড়ে আনন্দ উপভোগ করতে পারেন। ধর্মসাগর থেকে সটান চলে গেলাম শালবান বিহারে।
যতই স্থানটি এগিয়ে আসছিল মনের মধ্যে কেমন একটা অজানা শিহরণ। একসময় ঢুকে পড়লাম শালবন বিহারে। যেন এক বিস্ময়ের রাজ্য। বিশাল এক নগরীর ধ্বংসাবশেষ যেন জেগে উঠেছে। ইতিহাস গুগল করলেই পেয়ে যাবেন তবে সেখানে অবস্থানের অনুভূতি একমাত্র গেলেই প্রত্যক্ষ করা সম্ভব। কত প্রাচীন এই সভ্যতা! যখন এই রাজারা শাসন করতেন বা সাধনা করতেন বৌদ্ধরা। এভাবেই বুঝি সভ্যতার ধ্বংস হয় বা নতুন সভ্যতার জন্ম নেয়।
এই স্থানটি পড়েছে কোটবাড়িতে। ১৮৭৫ সালের শেষ দিকে সড়ক তৈরির সময় একটি ইমারতের ধ্বংসাবশেষ উন্মোচিত হয়ে পড়ে। সে সময় আবিষ্কৃত ধ্বংসাবশেষকে একটি দুর্গ বলে অনুমান করা হয়েছিল। ১৯১৭ সালে ঢাকা জাদুঘরের অধ্যক্ষ নলিনী কান্ত ভট্টাশালী সে এলাকায় যান এবং অনুসন্ধান চালিয়ে ধ্বংসাবশেষটিকে হরিকেল দেবের তাম্রশাসনের (খ্রিস্টীয় তেরো শতক) দুর্গ ও বিহার পরিবেষ্টিত পট্টিকরা নগর বলে সিদ্ধান্ত নেন। যদিও অপর প্রত্নতাত্ত্বিকদের মত অনুযায়ী এটি ছিল জয়কর্মান্তবসাক নামক একটি প্রাচীন নগরীর ধ্বংসাবশেষ। আবার খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীর শেষ থেকে অষ্টম শতাব্দীর প্রথম ভাগে দেববংশের চতুর্থ রাজা শ্রীভবদেব এটি নির্মাণ করেন। শালবন বিহারের ছয়টি নির্মাণ ও পুনঃনির্মাণ পর্বের কথা জানা যায়। বিহারের চারদিকের দেয়াল পাঁচ মিটার পুরু।
কক্ষগুলো বিহারের চার দিকের বেষ্টনী দেয়াল পিঠ করে নির্মিত। অঙ্গনের ঠিক মাঝে কেন্দ্রীয় মন্দির। বিহারে সর্বমোট ১৫৫টি কক্ষ আছে। ধারণা করা হয় যে এখানে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা থাকতেন ও ধর্মচর্চা করতেন। এমন নানা নিদর্শন দেখে প্রাচীন সভ্যতার কিছুটা ধারণা পাওয়া যাবে।
এরপর পাশেই রয়েছে ময়নামতি জাদুঘর। নানা সময়ে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে বিহারটির ধ্বংসাবশেষ পাওয়া তাম্রলিপি, স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা, অসংখ্য পোড়া মাটির ফলক বা টেরাকোটা, সিলমোহর, ব্রোঞ্জ ও মাটির মূর্তি রয়েছে সেখানে। ছবির নিচে রয়েছে ইতিহাসও। ময়নামতি জাদুঘর শেষে দেখতে গেলাম পাশের নব শালবন বিহার।
এটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম বিহার বা শান্তি প্যাগোডা। নব শালবন বিহারে ঢুকতেই রয়েছে সোনালি রঙের ৩০ ফুট উচ্চতার বিশাল বুদ্ধের মূর্তি। রোদের আলোয় সেটি যেন দ্রুতি ছড়াচ্ছে। মূর্তির পাশেই রাজকীয়ভাবে নিরাপত্তা দেয়ার ভঙ্গিতে স্থাপিত আছে গর্জনরত একই রঙের দুটি সিংহ। রয়েছে সোনালি মোটক। পুরো মন্দিরটিই নানা রকম কারুকার্যে ভরা।
প্রকৃতির যে অকৃপণ দান সেটি বোঝা যাবে কোর্টবাড়িতে অবস্থিত বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমিতে (বার্ড) গেলে। সামনে থেকে বোঝার উপায় নেই এটি এতটা সুন্দর। যতই গহিনে যাওয়া যাবে ততই যেন আনন্দে ভরপুর। সবুজে সবুজে একাকার। পল্লী উন্নয়ন বিষয়ে গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও প্রায়োগিক কাজ করা হয় এখানে। সাধারণ মানুষও অনুমতিসাপেক্ষে এটিকে পিকনিক স্পট হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। ভেতরে রয়েছে কয়েকটি টিলা। নীলাচল পাহাড় যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। এ এক সবুজ রাজ্য।
দুপুরের খাবারের বিরতির পর বিকালের দিকে আবার বেরিয়ে পড়া। গেলাম ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রিতে। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাধি। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত ব্রিটিশ, কানাডিয়ান, অস্ট্রেলিয়ান, আফ্রিকান, জাপানি, আমেরিকান, ভারতীয় ও নিউজিল্যান্ডের ৭৩৭ সৈন্যের সমাধিস্থল এটি।
এরপর প্রয়োজনীয় অনুমতি নিয়ে গেলাম কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে অবস্থিত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরিচালনাকারী সেনানায়কের সদর দফতর দেখতে। আগস্ট ১৯৪৩। পৃথিবীর বহু দেশ জড়িয়ে পড়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। বাদ যায়নি তৎকালীন ব্রিটিশ কলোনি ভারত ও বার্মা। আজকের বাংলাদেশ তখন ভারতের অংশ। সেই যুদ্ধে মফস্বল শহর কুমিল্লা হয়ে ওঠে ভারত ও বার্মায় যুদ্ধ পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু। ময়নামতিতে তখন স্থাপিত হয়েছিল ব্রিটিশ তথা মিত্রশক্তির ১৪ আর্মির সেনানায়ক ফিল্ড মার্শাল উইলিয়াম জোসেফ স্লিমের সদর দফতর বা কমান্ড পোস্ট।
ব্রিটিশদের শত্রু জাপানি বিমান বাহিনীর হামলা থেকে সুরক্ষার জন্য মাটির নিচে গড়ে তোলা হয় এই কমান্ড পোস্ট। আশপাশের ছোট-বড় টিলার সঙ্গে মিল রেখে কমান্ড পোস্টের উপরিভাগ ঢেকে দেয়া হয় টিলার আদলে। জাপানিদের ঘায়েল করার প্রায় সব পরিকল্পনাই করা হয়েছিল এই কমান্ড পোস্টে বসে। ছবি তোলা বারণ তাই সেখানে কোনো ছবি তুললাম না। এর মধ্যে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে।
কুমিল্লার সবুজের রূপ যেন আরও খোলতাই হয়েছে। এরপর গেলাম চারদিকে নাম না জানা অসংখ্য ফুল ফুটে থাকা রূপসাগর দেখতে। সবুজ ছায়া ঘেরা পার্কটি যেন সারাদিনের ভ্রমণ ক্লান্তি নিমিষেই দূর করে দিল।
মাঝে একটি লেক, নৌকা যেন বিনোদনের মাত্রা বাড়িয়ে দিল বহুগুণ। কুমিল্লায় হয়তো দেখার আরও অনেক কিছুই রয়েছে। কিন্তু একদিনের ভ্রমণের জন্য এটুকুই। কুমিল্লা যাব রসমালাই খাব না তা তো হয় না। মনোহরপুরের আদি মাতৃভাণ্ডার থেকে রসমালাই খেলাম আর নিয়েও এলাম।
কীভাবে যাবেন : ঢাকার কমলাপুর বা আরামবাগ থেকে কিছুক্ষণ পরপরই বাস ছাড়ে কুমিল্লার উদ্দেশ্যে। ভাড়া এসি নন-এসি ভেদে ২০০ থেকে ৩৫০ টাকা। আর মনে রাখবেন বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানের প্রবেশ ফি রয়েছে। এছাড়া কোথাও যেতে হলে গাড়ি রিজার্ভ করতে পারেন অথবা স্থানীয়দের কাছে জেনে এখানে সেখানে যেতে পারেন।
কোথায় থাকবেন : কুমিল্লায় থাকার জন্য নানা মানের হোটেল রয়েছে। দেখে শুনে একটাতে উঠলেই হল। আর আমার মতো বন্ধুর বাড়ি থাকলে তো কথাই নেই।








