২৯ দিনে ৩৩ ঘণ্টা লোডশেডিং

0
434

বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে আরইবি (পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড) ও পিজিসিবি (পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ) সারা দেশে তামাশা শুরু করেছে।

দুর্বল সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার কারণে কোথাও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দিতে পারছে না এই দুই প্রতিষ্ঠান। তাদের খামখেয়ালিপনায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে দেশের লাখ লাখ শিল্পকারখানা। কখনও আরইবি কখনো বা পিজিসিবির কারণে একের পর এক করতে হচ্ছে লোডশেডিং ও লাইন শাটডাউন।

মোটকথা সরকারের এই দুই প্রতিষ্ঠানের ধ্বংসাত্মক প্রতিযোগিতায় নাভিশ্বাস উঠেছে শিল্প-কলকারখানার মালিকদের। উল্লেখ্য, পিজিসিবি সারা দেশে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন নির্মাণ করছে। অপরদিকে আরইবি এসব সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন ব্যবহার করে বিদ্যুৎ সররবাহ করছে।

দেশের একটি জেলায় গত ৬ মাসের লোডশেডিংয়ের তথ্য যাচাই-বাছাই করে দেখা গেছে, আরইবি আর পিজিসিবির খামখেয়ালিপনায় ২৯ দিনে ৩৩ ঘণ্টা লোডশেডিং হয়েছে। এই লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল সর্বনিম্ন ২ মিনিট থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ৬ ঘণ্টা।

শিল্পকারখানার মালিকরা বলেছেন- উৎপাদনের পিক আওয়ারেই লোডশেডিং করা হচ্ছে। যা সরকার ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান ধ্বংসের ষড়যন্ত্র। তাদের অভিযোগ- বিশ্বের সব শিল্পোন্নত দেশে সঞ্চালন লাইন মেরামত ও আপগ্রেডের কাজ করা হয় অপ-পিক আওয়ার কিংবা রাতে। যখন কারখানা বন্ধ থাকে।

কিন্তু আমাদের দেশে হচ্ছে তার উল্টো। কিন্তু আরইবি আর পিজিসিবির কেউ এটা মানতে নারাজ। আরইবির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মঈন উদ্দিন বলেছেন, লোডশেডিং হবেই। পৃথিবীর কোনো দেশ বলতে পারবে না, তারা লোডশেডিংমুক্ত।

অপরদিকে পিজিসিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা বদরুদ্দোজা সুমন যুগান্তরকে বলেছেন, মাঝে মাঝে সঞ্চালন লাইন আপগ্রেড করতে গিয়ে লাইন শাটডাউন করতে হচ্ছে। কিন্তু তারা দেখেছেন, পিজিসিবি দ্রুত কাজ শেষ করলেও যথাসময়ে আরইবি লাইন চালু করতে পারছে না। এ কারণে মাঝে মাঝে লোডশেডিংয়ের মাত্রা একটু বেড়ে যাচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১৪ জুন দুই দফায় আরইবি ১ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট লোডশেডিং করেছে। পিজিসিবির শাহজীবাজার সাব-স্টেশনের আওতাধীন হবিগঞ্জসহ আশপাশের এলাকা এ সময় অন্ধকার ছিল।

বিকাল ৪টা ৬ মিনিট থেকে ৫টা ৩৩ মিনিট পর্যন্ত ১ ঘণ্টা ২৭ মিনিট এবং ৬টা ৩৮ মিনিট থেকে ৬টা ৪৭ মিনিট পর্যন্ত ৯ মিনিট এই লোডশেডিং ছিল। মাত্র ৬ দিনের ব্যবধানে ৮ জুন একনাগাড়ে ২ ঘণ্টা ৬ মিনিট লোডশেডিং করেছে আরইবি। একইভাবে সকাল ১০টা ২ মিনিট থেকে দুপুর ১২টা ৮ মিনিট পর্যন্ত একনাগাড়ে ছিল এই লোডশেডিং।

১৯ সেপ্টেম্বর বেলা ১টা ৩ মিনিট থেকে ২টা ১৮ মিনিট পর্যন্ত ১ ঘণ্টা ১৫ মিনিট লোডশেডিং করেছে আরইবি। ১৫ নভেম্বর সন্ধ্যা ৬টা ৬ মিনিট থেকে ৭টা ২৩ মিনিট পর্যন্ত একনাগাড়ে ১ ঘণ্টা ১৭ মিনিট লোডশেডিং করেছে আরইবি। একই দিন ৫টা ৫০ মিনিট থেকে ৬টা ২ মিনিট পর্যন্ত ছিল লোডশেডিং।

গত ১৫ ডিসেম্বর পিজিসিবি তাদের ট্রান্সফরমার আপগ্রেডের জন্য বেলা ১১টা থেকে বিকাল পৌনে ৫টা পর্যন্ত ৫ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট লোডশেডিং করে। কিন্তু আরইবি বলেছে, ওই ৫ ঘণ্টায়ও পিজিসিবি কাজ শেষ করতে পারেনি। যে কারণে ১৭ ডিসেম্বর আবারও আড়াই ঘণ্টা লোডশেডিং করতে হয়েছে আরইবিকে।

অপরদিকে পিজিসিবি বলেছে, তারা যথাসময়ে কাজ শেষ করে আরইবিকে জানালেও যথাসময়ে লাইন চালু না করে বেশি সময় লোডশেডিং করেছে। জানা গেছে, এদিন সকাল সাড়ে ৭টা থেকে সাড়ে ৯টা আবার বেলা ১টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত লোডশেডিং করা হয়েছে।

এভাবে ৯ জুন ৯ মিনিট, ১২ জুন ৩ দফায় ২৫ মিনিট লোডশেডিং করা হয়। এর মধ্যে দুপুর ১টা ৭ মিনিট থেকে ১টা ১৬ মিনিট, ৪টা থেকে ৪টা ৬ মিনিট এবং ৪টা ২৫ মিনিট থেকে ৪টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত লোডশেডিং ছিল। ১৫ জুন ১ ঘণ্টা ৮ মিনিট লোডশেডিং ছিল আরইবিতে।

সন্ধ্যা পোনে ৭টা থেকে একনাগাড়ে ৭টা ৫৩ মিনিট পর্যন্ত ছিল এই লোডশেডিং। একইভাবে ২২ জুন ৭ মিনিট, ২৬ জুন ৩ দফায় ১ ঘণ্টা ১১ মিনিট ছিল লোডশেডিং। আর ২৭ জুন লোডশেডিং ছিল ১ ঘণ্টা ২৯ মিনিট। এভাবে ২৯ জুন ১ ঘণ্টা ২ মিনিট, ৩০ জুন ছিল দুই দফায় ৩৮ মিনিট।

আগস্টে ৫ দিনে লোডশেডিং করা হয়েছে ৮ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট। এর মধ্যে ১০ আগস্ট ৮ মিনিট, ১১ আগস্ট সাড়ে ৬ ঘণ্টা, ২১ আগস্ট ৪০ মিনিট, ২২ আগস্ট ৪০ মিনিট এবং ২৭ আগস্ট ৫০ মিনিট লোডশেডিং করে আরইবি।

সেপ্টেম্বর মাসেও ৫ দিনে ১ ঘণ্টা ৫২ মিনিট লোডশেডিং করেছে আরইবি। এর মধ্যে ১ সেপ্টেম্বর ২০ মিনিট, ২ সেপ্টেম্বর ১৮ মিনিট, ৩ সেপ্টেম্বর ৪ মিনিট, ৭ সেপ্টেম্বর ৫ মিনিট এবং ১৯ সেপ্টেম্বর ১ ঘণ্টা ১৫ মিনিট লোডশেডিং করে আরইবি। অক্টোবর মাসে ১ দিনে ৪৫ মিনিট লোডশেডিং করে আরইবি।

নভেম্বর মাসে ৭ দিনে ৩ ঘণ্টা ৭ মিনিট লোডশেডিং করে আরইবি। এর মধ্যে ছিল ২ নভেম্বর ১৬ মিনিট, ৬ নভেম্বর দুই দফায় ৩১ মিনিট, ১৫ নভেম্বর ২০ মিনিট, ১৬ নভেম্বর দুই দফায় ১ ঘণ্টা ২৯ মিনিট, ১৭ নভেম্বর ১১ মিনিট, ২৩ নভেম্বর ১০ মিনিট ও ২৪ নভেম্বর ১০ মিনিট।

ডিসেম্বর মাসের ১৭ দিনের মধ্যে দুই দফায় ৮ ঘণ্টা ১৫ মিনিট লোডশেডিং করেছে আরইবি। এর মধ্যে ১৫ ডিসেম্বর বেলা ১১টা থেকে ৪টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত ৫ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট লোডশেডিং করেছে আরইবি। এ ছাড়া ১৭ ডিসেম্বর দুই দফায় ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট লোডশেডিং করা হয়।

জানা গেছে, শুধু হবিগঞ্জ নয় এভাবে দেশের কোথাও শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দিতে পারছে না পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) ও পিজিসিবি। শিল্পের জন্য কোয়ালিটি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা তো দূরের কথা গ্রামাঞ্চলেও আরইবির লোডশেডিং এখন চরমে। প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে বিদ্যুৎ নিয়ে বহু শিল্পমালিক ধরাশায়ী।

আরইবির বিদ্যুৎ নিয়ে শিল্প চালানো তো দূরের কথা অব্যাহত লাইন ট্রিপের কবলে পড়ে যন্ত্রপাতি সব অকেজো হয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ সেক্টরের বিশ্লেষকদের কয়েকজন যুগান্তরকে জানিয়েছেন, সরকার শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ড গড়ে বাহাবা নিতে চায়। কিন্তু সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন আধুনিকায়নে নজর নেই। এর ফলে উৎপাদিত বিদ্যুৎ অপচয় বা নষ্ট হচ্ছে।

ভুক্তভোগীদের মধ্যে বেশ কয়েকজন শিল্পপতি তাদের শিল্পকারখানায় প্রতিদিন কতবার বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে এবং তাতে বিপুল অঙ্কের ক্ষতির বিষয়টি আরইবির নজরে এনে প্রতিকার দাবি করেন।

এর মধ্যে আরইবি সূত্রে প্রাপ্ত একজন ভুক্তভোগীর প্রদত্ত তথ্যে দেখা গেছে, তার একটি কারখানায় একবার বিদ্যুৎবিভ্রাট ঘটলে ৫২ লাখ টাকা ক্ষতি হয়।

এ হিসাবে তার ৫টি কারখানায় একবার বিদ্যুৎবিভ্রাট হলে তিনি ২ কোটি ৭০ লাখ টাকার আর্থির ক্ষতির সম্মুখীন হন। কারণ একবার বিদ্যুৎ গেলে কারখানার অত্যাধুনিক কম্পিউটারাইজ ও প্রোডাকশন লাইন ব্যাচ ওয়াইজ হওয়ায় প্রতিটি কারখানা পরবর্তী উৎপাদনে যেতে কমপক্ষে ২ ঘণ্টা সময় লাগে।

এতে ওই ব্যাচটির সম্পূর্ণ মালামাল নষ্ট হয়ে যায়। যার মূল্য প্রতি ঘণ্টায় ২৬ লাখ টাকা করে ২ ঘণ্টায় ৫২ লাখ টাকা। এ ছাড়া কম্পিউটারাইজ মেশিনারিজগুলো চালু অবস্থায় হঠাৎ বিদ্যুৎবিভ্রাটের কারণে বন্ধ হলে সফটওয়্যার সিস্টেমও নষ্ট হয়ে যায়। এতে ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়ে যায়।

ব্যবসায়ীরা বলেছেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিয়ে এ সংকট দেশের শিল্পকারখানার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। যেনতেন ছুঁতোয় বিদ্যুৎবিভ্রাট ঘটিয়ে দেশের অগ্রসরমান শিল্পের লাগাম টেনে ধরা এই ষড়যন্ত্রের উদ্দেশ্য। ভুক্তভোগী ও বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে একটি চক্র দীর্ঘদিন থেকে দেশের স্বার্থবিরোধী এ ধরনের কাজে যুক্ত।

যারা আগে বিদ্যুৎ ঘাটতির অজুহাতে নানা টালবাহানা করত, এখন প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে অভাবনীয় সাফল্য অর্জিত হলেও তারা নতুন করে এ সেক্টর নিয়ে ষড়যন্ত্রের ফাঁদ পেতেছে।

ফলে বেসরকারি খাতে সরকারের বিনিয়োগনীতি সহায়তা চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া শিল্পোদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীদের সীমাহীন ক্ষতি হচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ না পেয়ে অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

আপনার মন্তব্য জানান