মজুদ পর্যাপ্ত, সরবরাহ চ্যানেলও ঠিকঠাক আছে। তারপরও ভোগ্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। পাইকারি ও খুচরা বাজার, ভোক্তা পর্যায়- সর্বত্রই এ নিয়ে শঙ্কা বিরাজ করছে। বরাবরই রমজান সামনে রেখে একটি চক্র সিন্ডিকেট করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়।
এবার রমজানের দেড় মাস বাকি থাকতেই সক্রিয় হয়ে উঠেছে সেই চিহ্নিত সিন্ডিকেট। ইতিমধ্যেই চাল-ডাল থেকে শুরু করে বাড়তে শুরু করেছে গরু, খাসি ও মুরগির মাংসের দাম। সঙ্গে রমজানে অতি ব্যবহৃত পণ্যের দামও বাড়তির দিকে।
বৃহস্পতিবার যুগান্তরের কাছে অভিযোগ করে ভোক্তারা বলেছেন- প্রতি বছর রমজান এলেই এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে সব ধরনের খাদ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। যার কারণে ভোক্তাদের হিমশিম খেতে হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে না। একাধিক পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। মনে হচ্ছে এবারের রমজানেও সেই চক্রটি বাড়তি মুনাফার লোভে ভোক্তার পকেট কাটবে।
বৃহস্পতিবার সরকারি সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) দৈনিক বাজার মূল্য তালিকায় দেখা গেছে, এদিন খুচরা বাজারে প্রতিকেজি গরুর মাংস বিক্রি হয়েছে ৫৫০-৫৬০ টাকা, যা এক মাস আগে ছিল ৫৩০-৫৫০ টাকা। এক মাসে গরুর মাংসের দাম বেড়েছে ১ দশমিক ৫৮ শতাংশ। বৃহস্পতিবার প্রতি কেজি খাসির মাংস বিক্রি হয়েছে ৮০০-৮৫০ টাকা, যা ১ মাস আগে বিক্রি ছিল ৭৫০-৮০০ টাকা, ১ মাসে বেড়েছে ৩ দশমিক ২৩ শতাংশ। এছাড়া প্রতিকেজি দেশি মুরগি বিক্রি হয়েছে ৪০০-৪৫০ টাকা, ১ মাসে বেড়েছে ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ।
এদিকে ডালের মধ্যে মসুরের ডালের (ছোট দানা) কেজি বিক্রি হয়েছে ৯৫-১০৫ টাকায়, গত বছর ছিল ৮৫-৯৫ টাকা। বছরের বেড়েছে ১৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। মুগ ডালের কেজি ১৩০-১৩৫ টাকা, ১ মাস আগে ছিল ৯০-১২০ টাকা, মাসে বেড়েছে ১৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ, বছরে ১৯ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। চিনির কেজি বিক্রি হয়েছে ৬৫-৭০ টাকা, ১ মাস আগে ছিল ৬৩-৬৫ টাকা, মাসের ব্যবধানে কেজিতে বেড়েছে ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ, বছরে ২৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
ভোজ্যতেলের মধ্যে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন বিক্রি হয়েছে ৮৮-৯২ টাকা, গত বছর ছিল ৮০-৮৪ টাকা, দাম বছরে বেড়েছে ৯ দশমিক ১৫ শতাংশ। পাম অয়েল (সুপার) প্রতি লিটার বিক্রি হয়েছে ৮০-৮২ টাকা, গত বছর ছিল ৬৬-৭০ টাকা, বছরে বেড়েছে ১৬ দশমিক ১৮ শতাংশ।
মাসের ব্যবধানে সরু চাল শূন্য দশমিক ৮৮ শতাংশ বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি ধরনের চাল মাসের ব্যবধানে ২ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া সব ধরনের মোটা চাল মাসের ব্যবধানে ৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে।
রাজধানীর নয়বাজারে নিত্যপণ্য কিনতে আসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক জাকির হোসেন যুগান্তরকে বলেন, আমরা সারা বছর নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি নিয়ে শঙ্কিত থাকি। আর রমজান এলেই এ শঙ্কা আরও বেড়ে যায়। কারণ রমজান এলেই ভোক্তা ঠকানোর পাঁয়তারা করে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। কারণ তারা জানে বছরের অন্যান্য মাসের তুলনায় রমজানে নিত্যপণ্যের বাড়তি চাহিদা থাকে।
তিনি বলেন, জানুয়ারি থেকেই রমজানের পণ্যের দাম এক দফা বাড়িয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। রমজানে আরও যে বাড়বে না, তা কিভাবে মেনে নেই? তিনি বলেন, চাল-ডালসহ সব ধরনের মাংসের দামও বেড়েছে। সবজির দরও অনেক। তাই সরকারের এবার এ বিষয়ে এখন থেকেই গভীর নজরদারি থাকতে হবে। কোনো অনিয়ম পেলে আইনের আওতায় আনতে হবে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে নিত্যপণ্য কিনতে আসা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী রাজিব আহমদ যুগান্তরকে বলেন, গত বছর এ সময়ও পণ্যের দাম স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু রমজান ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছিল। তাই মনে হচ্ছে এবারও পণ্যের দাম বাড়বে। ইতিমধ্যে কয়েকটি খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েও গেছে। সরকারে বাজার মনিটরিং সংস্থাদের সজাগ থাকতে হবে।
জানতে চাইলে কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান যুগান্তরকে বলেন, রমজানে সব ধরনের খাদ্যপণ্যের বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়। এ সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। তবে এবার দেশে পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় দাম বৃদ্ধির কোনো সুযোগ নেই। তাই সরকারকে এবার রমজানে একটু বেশি সজাগ থাকতে হবে। যাতে অসাধুদের কারসাজিতে পণ্যের দাম না বাড়ে। এতে সরকারেরও লাভ হবে আর ভোক্তারাও উপকৃত হবেন।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার যুগান্তরকে বলেন, ভোক্তাদের দুশ্চিন্তার কারণ নেই। এবার রমজান আসার আগেই বাজারে বিশেষ মনিটরিং সেল কাজ করবে। রোজাজুড়ে বাজার মনিটরিং করা হচ্ছে। তাই এ বছর রমজানে অসাধু ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে পণ্যের দাম বাড়াতে পারবে না।
তিনি বলেন, রমজানে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে অধিদফতর বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সঙ্গে নিয়ে প্রতিদিন দুটি অভিযান চালানো হচ্ছে। এছাড়া নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরি করলে বা খাবারে ভেজাল দিলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ভোক্তা অধিদফতরের পাশাপাশি সরকারের একাধিক সংস্থা বাজার মনিটরিং করছে। এতে এবার কোনো অসাধু ব্যবসায়ী কারসাজি করতে পারবে না।
জানতে চাইলে সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মুখপাত্র মো. হুমায়ুন কবির যুগান্তরকে বলেন, দেশে রমজাননির্ভর পণ্যের পর্যাপ্ত মজুদ আছে। বাজারে সরবরাহও বেশি। অন্যদিকে রমজানের বাজার মোকাবেলায় ১০ গুণ বেশি পণ্য নিয়ে টিসিবিও প্রস্তুত। সব মিলিয়ে এবার রমজানে পণ্য মূল্য বাড়বে না বলে আশা করা হচ্ছে।








