ফিনল্যান্ড উচ্চশিক্ষার স্বর্গরাজ্যঃ ফোরকান মাহমুদ

0
1771

লেখকঃ ইঞ্জি. ফোরকান মাহমুদ, তাম্পেরে, ফিনল্যান্ড।

হাজার হৃদের দেশ নামে পরিচিত সবুজ অরণ্যে ঘেরা ইউরোপের সবচেয়ে উত্তরের দেশ ফিনল্যান্ড। হেলসিংকি এ দেশের সর্ববৃহৎ শহর ও রাজধানী। ফিনল্যান্ড বর্তমানে উচ্চশিক্ষা আকাঙ্ক্ষীদের জন্য স্বর্গে পরিণত হয়েছে যার একমাত্র কারণ উচ্চমানের শিক্ষাব্যবস্থা।

শিক্ষা একটি জন্মগত অধিকার ও রাষ্ট্রকর্তৃক প্রদত্ত সেবা হিসেবে বিবেচিত হয় ফিনল্যান্ডে। এখানে ৭ থেকে ১৬ বছর বয়সী ছেলে মেয়েরা বিনামূল্যে শিক্ষা লাভ করে। প্রাথমিক স্কুলে ৬ বছর এবং মাধ্যমিক স্কুলে ৩ বছর লেখাপড়া করা সবার জন্য বাধ্যতামূলক। গবেষণায় ফিনল্যান্ডের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা বিশ্বের শিক্ষা ছকের শীর্ষে অবস্থান করছে। গবেষণার ফলাফল ভাষা, গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়াবলীর ভিত্তিতে হয়েছে।

উচ্চশিক্ষার জন্য ফিনল্যান্ডে অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়, অসংখ্য কলেজ এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ স্কুল রয়েছে। ইউরোপের যে দেশেগুলোতে টিউশন ফি ছাড়া উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা যায় তাদের একটি ফিনল্যান্ড। তাই এদেশে প্রতি বছর এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে প্রচুর শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায়। তবে তাদের বেশিরভাগই স্নাতক পর্যায়ের বিভিন্ন প্রোগ্রামে ভর্তি হয়। এদেশে বিভিন্ন ভাষা শিক্ষার বিশেষ সুযোগ রয়েছে। এখানে অভিবাসীদের ছেলেমেয়েদের জন্য তাদের নিজেদের ভাষা শিক্ষার সুযোগও রয়েছে, যেটা যুক্তরাজ্যের মতো বহু বর্ণ ও সংস্কৃতির দেশেও অনুপস্থিতি।

ফিনল্যান্ডে উচ্চশিক্ষার জন্য বিশেষ করে স্নাতক স্তরে ভর্তির জন্য কেন্দ্রীয় একটি প্রতিষ্ঠান আছে (https://www.admissions.fi/) যার মাধ্যমেই শিক্ষার্থীদেরকে বিভিন্ন ফলিত বিজ্ঞানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির জন্য আবেদন করতে হয়। এ ওয়েবসাইটে এদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা তথ্য পাওয়া যাবে। তাছাড়া সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির জন্য আরেকটি ওয়েব পোর্টাল আছে (http://universityadmissions.fi/) যার মাধ্যমে ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোনটিতে ভর্তির জন্য আবেদন করা যায়। কিন্তু স্নাতকোত্তর বিষয়াবলীর জন্য এককভাবে সম্পৃক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনার জন্য আবেদন করার সুযোগ আছে। কোন রকম সমস্যা দেখা দিলে এওয়েবসাইট দু’টো থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম সংগ্রহ করে গুগল সার্চ ইঞ্জিনের মাধ্যমে (www.google.com) অনুসন্ধান করলে সহজে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবপেজ কিংবা অন্য কোন সাইটে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তাছাড়া এ নিবন্ধের শেষের দিকে এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নাম ও তাদের ওয়েব এড্রেসগুলো দেয়া আছে। তা থেকে সরাসরি যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ওয়বেসাইটে যেতে পারেন।

শিক্ষার মাধ্যম

এদেশে ৩ ভাষায় শিক্ষা প্রদআন করা হয়, যথাঃ ইংরেজী, সুইডিশ আর ফিনিশ। তবে মজার ব্যাপার হল, এদেশে প্রায় সবাই ইংরেজী ভাষায় কথা বলতে পারে। সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী ভাষায় সীমিত সংখ্যক কোর্স রয়েছে- তবে আশার কথা, Applied Science বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী ভাষায় বিস্তর সংখ্যক কোর্স রয়েছে। তাই যারা Applied Science এর উপর কোর্স করবেন, তাদের জন্য এদেশে সুযোগ একটু বেশি। ফিনল্যান্ডে মাস্টার্স কোর্সে ভর্ত্তির জন্য বয়সের কোন বাধা নেই।

উচ্চশিক্ষার কাঠামো ও স্তর বিন্যাস

উচ্চশিক্ষার জন্য ফিনল্যান্ডে ২৭ টি ফলিত বিজ্ঞানের (Applied Sciences) এবং ১৬টি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। ফলিত বিজ্ঞানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত পলিটেকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়। এদেশে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে হেলসিংকি বিশ্ববিদ্যালয় সবচেয়ে বড়। ১৬৪০ সালে স্থাপিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ১৮২৮ সালে দেশের রাজধানী হেলসিংকিতে স্থানান্তরিত হয়। ২৭ টি ফলিত বিজ্ঞানের বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ২৪ টিতে একাডেমিক লেখাপড়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তন্মধ্যে ৫টি ফলিত বিজ্ঞানের বিশ্ববিদ্যালয় রাজধানী হেলসিংকি এলাকায় অবস্থিত। সেগুলো হল আরকাডা (Arcada), হাগা-হেলিয়া (Haaga-Helia), হেলসিংকি মেট্রোপোলিয়া (Helsinki Metropolia), ডায়াকনিয়া (Diaconia) এবং লাউরিয়া (Laurea)।

ফিনল্যান্ডের উচ্চশিক্ষার কাঠামো দু’ভাগে বিভক্ত। স্নাতক স্তর (Undergraduate Level) ও স্নাতকোত্তর স্তর (Postgraduate Level)। স্নাতকোত্তর আবার দু’স্তরে বিন্যাস্ত- মাস্টার্স ও ডক্টোরাল। উচ্চশিক্ষার এ দু’স্তরে যেসব ডিগ্রি অর্জন করা যেতে পারে, সেগুলো হলো- ক) ব্যাচেলর ডিগ্রি, খ) মাস্টার্স ডিগ্রি ও গ) ডক্টরেট বা পিএইচডি ডিগ্রি।

মাস্টার্স করতে দেড় থেকে দুই বছর লাগে আর ১২০ ক্রেডিট সম্পপন্ন করা লাগে। কিন্তু যে কেউ চাইলে বেশি সময়ও নিতে পারে। তবে চার বছরের মধ্যেই মাস্টার্স কোর্স শেষ করতে হবে। সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দুই বছরের মধ্যে মাস্টার্স কোর্স শেষ করার জন্য উৎসাহ দিয়ে থাকে। আর ডক্টরাল কোর্সের ক্ষেত্রে সাধারণ সময় লাগে তিন থেকে ছয় বছর।

ফিনল্যান্ডে ডক্টরেট করতে হলেও ইংরেজী ভাষায় দক্ষতা অবশ্যই থাকতে হবে। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়েই ডক্টরাল কোর্সে ভর্তি হতে হলে অবশ্যই আইইএলটিএস (IELTS) স্কোর অথবা আর সমমানের ইংরেজী ভাষা কোর্সের সার্টিফিকেট থাকতে হবে। স্নাতকোত্তর স্তরে ভর্তির জন্য সাধারণ সর্বনিম্ন আইইএলটিএস স্কোর ৬.৫ দরকার। এদেশে ডক্টরাল কোর্সে ভর্তির জন্য সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট থেকে পছন্দের বিষয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে। তারাও ভর্তি সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সহযোগিতা করতে পারেন।

এদেশেও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের মতোই দুই সেমিস্টারে পড়াশুনা পরিচালিত হয়। প্রথম সেমিস্টার হলো শরৎকালীন (Autumn) সেমিস্টার- আগস্ট থেকে ডিসেম্বর। আর দ্বিতীয় সেমিস্টার হলো বসন্তকালীন (Spring) সেমিস্টার- জানুয়ারি থেকে জুলাই। একটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার যে, ফিনল্যান্ডে ব্যাচেলর বা মাস্টার্স প্রোগ্রামে ভর্তি হওয়ার বয়স কোন বাধা নয়। যে কোন বয়সেই ভর্তির জন্য আবেদন করা যায়।

স্নাতক স্তর 

এদেশের অধিকাংশ স্নাতক কোর্সই কর্মদক্ষতা তথা পলিটেকনিক ভিত্তিক। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, এখানে স্নাতক স্তরে ভর্তি হওয়ার জন্য ভর্তি পরিক্ষা দিতে হয়। ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার জন্য প্রথমে অনলাইনে আবেদন করতে হয়। আবেদনপত্র পূরণের সময় পছন্দের ক্রমানুসারে ৬ টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নির্বাচন করা যায়। স্নাতক কোর্সে ভর্তির জন্য টোফেল (TOEFL)-এ ৫৫০ স্কোর কিংবা আইইএলটিএস (IELTS)-এ কমপক্ষে ৬.০ স্কোরসহ এইচএসসি বা এর সমমান শিক্ষাগত যোগ্যতার যেকোন ব্যক্তি আবেদন করতে পারবে।

আবেদনের ক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয়

আবেদন করার সময় একজন শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ ৬ টি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৬টি বিষয় পছন্দ করতে পারবে।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

অনলাইনে আবেদন করার পর এসএসসি, এইসএসসি-এর মার্কশিট, সার্টিফিকেট ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজ পত্রসহ যে বিশ্ববিদ্যালয়টি পছন্দের তালিকায় প্রথম থাকবে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি অফিসের ঠিকানায় পাঠিয়ে দিতে হবে। তারপর ওই বিশ্ববিদ্যালয় আবেদনকারীকে ভর্তি পরিক্ষার তারিখ ও সময় জানিয়ে ইমেইল করবে কিংবা চিঠি পাঠাবে।

ভর্তি পরীক্ষায় সাধারণত সাধারণ গণিত, আইকিউ (IQ), বিশ্লেষণাত্মক প্রশ্ন (Analytic Questions) এবং বিষয়ভিত্তিক প্রশ্ন থাকে। ভর্তি পরিক্ষার প্রাপ্ত নম্বরের উপর ভিত্তি করে পছন্দের ক্রমানুসারে যেকোন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ দেয়া হয়। ভর্তি পরীক্ষা সাধারণত এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে হয়ে থাকে। আর অনলাইন আবেদন করার শেষ সময় সাধারণত ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ থাকে।

যে সব বিষয়ে পড়াশুনার সুযোগ রয়েছে

স্নাতক ডিগ্রির উল্লেখযোগ্য কয়েকট কোর্স হচ্ছে মানুষের বয়:বৃদ্ধি ও বৃদ্ধত্বকালীন সেবা (Human Ageing and Elderly Service), আন্তর্জাতিক বাণিজ্য (International Business), প্লাস্টিক প্রযুক্তি (Plastic Technology), তথ্য প্রযুক্তি (Information Technology), পরিবেশ প্রকৌশল (Environmental Engineering), নার্সিং (Nursing), সামাজিক সেবা (Social Services), ভ্রমণ ও আতিথেয়তা ব্যবস্থাপনা (Tourism and Hospitality Management), বাণিজ্য তথ্য প্রযুক্তি (Business Information Technology) এবং ইলেকট্রোনিক্স (Electronics)।

স্নাতকোত্তর স্তর

স্নাতকোত্তর স্তরে ভর্তির জন্য সাধারণত কোন ভর্তি পরীক্ষা দিতে হয় না। অনলাইনে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের যোগ্যতা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নির্ধারিত ঠিকানায় পাঠিয়ে দিতে হবে। এরপর ভর্তির জন্য বিবেচিত হলে বিশ্ববিদ্যালয় চিঠি কিংবা মেইল দিয়ে জানাবে। এমনকি অফার লেটার পেলে প্রয়োজনে ১ বছরের জন্য ভর্তি ডেফার/পোস্টপন্ড করা যায়।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

স্নাতকোত্তর স্তরে আবেদন করতে সাধারণত আবেদনপত্রের সঙ্গে- একটি আগ্রহপত্র (Motivation Letter) কিংবা অধ্যয়নের উদ্দেশ্যের বিবৃতি(Statement of Purpose); দু’টো প্রত্যায়নপত্র  (Reference Letters)-  সাধারণত শিক্ষকদের কাছ থেকে; টোফেল/আইইএলটিএস স্কোর এবং বিষয় ভেদে কখনো কখনো জিআরই ফলাফল। এছাড়া প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েব সাইটে আবেদনের নির্ধারিত যোগ্যতার বিস্তারিত বিবরণ দেয়া থাকে। তাই আবেদনপত্র পাঠানোর সময় সে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট থেকে বিস্তারিত জেনে নিতে হবে।

স্নাতক শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী হলেও স্নাতকোত্তর কোর্সে আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। ফলাফল প্রকাশ হওয়ার আগেই যদি আবেদনের তারিখ শেষ হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে কাগজপত্র পাঠানোর সময় নিজ  বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটা চিঠি নেয়া যেতে পারে যে, ফলাফল খুব তাড়াতাড়ি প্রকাশিত হবে। আর যেহেতু ট্রান্সক্রিপ্ট পাওয়ার সুযোগ নাই, সেহেতু যতটুকু পর্যন্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলোর কপি সাথে পাঠালেই চলবে।

যে সব বিষয়ে পড়াশুনার সুযোগ রয়েছে

শিল্পকলার ইতিহাস (Art History), সৃজনশীল লেখা (Creative Writing), সামাজিক গবেষণা পদ্ধতি (Social Science Research Methods), বয়স্ক শিক্ষা ও জীবনব্যাপী শেখা (Adult Education and Life-long learning), অর্থনীতি (Economics), অর্থনীতি, রাষ্ট্র ও সমাজ (Economics, State and Society), গণতন্ত্র ও বৈশ্বিক পরিবর্তন (Democracy and Global Transformation), উন্নয়ন অধ্যয়ন (Development Studies), গণমাধ্যম ও বিশ্ব যোগাযোগ (Media and Global Communication),সংবাদ মাধ্যম অধ্যয়ন (Media Studies), উত্তর আমেরিকা অধ্যয়ন (North American Studies), ইউরোপ অধ্যয়ন (Europe Studies), ধর্ম, দ্বন্দ্ব ও সংলাপ (Religion, Conflict and Dialogue), আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক আইন (International Business Law), আন্তর্জাতিক গণ আইন (International Public Law), মেডিকেল ফিজিক্স অ্যান্ড কেমিস্ট্রি, জনস্বাস্থ্য (Public Health), প্যাথলজি, মহাকাশ গবেষণা (Space Research), বায়োকেমিস্ট্রি (Biochemistry), খাদ্য বিজ্ঞান (Food Science), খাদ্য রসায়ন (Food Chemistry), জীব-প্রযুক্তি (Biotechnology), জৈব তথ্য-প্রযুক্তি (Bioinformatics), বাস্তুবিদ্যা (Ecology), পরিবেশ বিজ্ঞান (Environmental Sciences), জীববৈচিত্র্য (Biodiversity), জৈব রসায়ন ও রাসায়নিক বিশ্লেষণ (Organic Chemistry and Chemical Analysis), জৈব রসায়ন ও রাসায়নিক জীববিজ্ঞান (Organic Chemistry and Chemical Biology), তড়িত তথ্য প্রযুক্তি (Electronic Information Technology), ফলিত গণিত (Applied Mathematics), পরিসংখ্যান (Statistics) ইত্যাদি।

পছন্দের কোর্স নির্বাচন

প্রথম কাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের Website ঘেটে, নিজের পছন্দ মত কোর্স বেছে নিতে হবে। ফিনল্যান্ডে Engineering সেকশনের কোর্সগুলোর চাহিদা বেশি। তাই, ফিনল্যান্ডে ভবিষ্যৎ খুঁজতে চাইলে অবশ্যই Engineering Stream -এ আবেদন করা শ্রেয়।

অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের মত এখানে দুই টি সেশন আছে। যথাঃ এটাম সেশন (Autumn Session) এবং স্প্রিং সেশন (Spring Session) । এটাম সেশন চলে আগস্ট থেকে ডিসেম্বর আর স্প্রিং সেশন চলে জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত।

ফিনল্যান্ডে মাস্টার্স প্রোগ্রাম ১.৫ থেকে ২ বছরের হয়ে থাকে আর এই প্রোগ্রামে আপনাকে সম্পন্ন করতে হবে ১২০ ক্রেডিট। আপনাকে অবশ্যই ৪ বছরের মধ্য মাস্টার্স কোর্স শেষ করতে হবে। আর ডক্টোরাল কোর্সে সময় দেওয়া হয়ে থাকে ৩ থেকে ৬ বছর। ডক্টোরাল সকল কোর্সের জন্য ইংরেজী ভাষাগত দক্ষতা বাধ্যতামূলক। মাস্টার্স বা ডক্টোরাল কোর্সে আবেদন করতে আপনার নূন্যতম IELTS Score 6.5 বা TOEFL- এ 550 Score থাকতে হবে।

আবেদনপত্র জমা ও ভর্তি প্রক্রিয়া

ফিনল্যান্ডের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর স্তরে ভর্তি হওয়ার জন্য সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইট থেকে আবেদনপত্র ডাউনলোড করতে হবে। আবার কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সরাসরি অনলাইনে আবেদন করতে হয়। তাছাড়া কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডাক যোগে মুদ্রিত আবেদন ফরমও সংগ্রহ করা যেতে পারে। প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্রসহ যথাসময়ে আবেদন করার পর অপেক্ষায় থাকতে হবে অফার লেটারের জন্য। তারা না জানানো পর্যন্ত অপেক্ষার পালা। তবে আবেদন করার পর থেকে ভিসা পাওয়া পর্যন্ত প্রায় বছর খানেক সময় লেগে যেতে পারে। আবেদন করার আগে ভালভাবে দেখে বুঝে বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন করতে হবে। কারণ কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করার জন্য ফি পরিশোধ করতে হয়।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

নির্বাচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত আবেদনপত্র কিংবা অনলাইন আবেদন ফরম সঠিকভাবে পূরণ করতে হবে। আবেদনপত্রের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে শিক্ষাগত যোগ্যতার সব রকমের সনদপত্র, মার্কশিট, আইইএলটি স্কোরের প্রত্যায়নপত্র, পাসপোর্টের ফটোকপি, আর্থিক দায়দায়িত্বের চিঠি (Letter of Sponsorship) ও পাসপোর্ট সাইজ ছবি। যে ক্ষেত্রে আবেদনপত্রের ফি থাকবে, সে ক্ষেত্রে তা পরিশোধের রসিদ আবেদনপত্রের সাথে জমা দিতে হবে। এখানে উল্লেখ্য করা দরকার যে, প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র অবশ্যই ইংরেজী অথবা ফিনিস কিংবা সুইডিস ভাষায় হতে হবে।

আবেদন করার সময় আগ্রহপত্র কিংবা অধ্যয়নের উদ্দেশ্যের বিবৃতিটা ভাল করে লিখতে হবে। আর প্রত্যয়নপত্রের ক্ষেত্রে বিভাগীয় অধ্যাপকের হলে ভাল হয়। কারণ ভর্তির জন্য বিবেচনার ক্ষেত্রে এ দু’টো ডোকুমেন্ট বেশ গুরুত্ব পেয়ে থাকে।

আবেদনপত্র আহবান ও জমা দানের সময় 

সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্নাতকোত্তর স্তরে ভর্তির জন্য আবেদনপত্র আহবান করে ডিসেম্বর এবং তা জমাদান করতে হয় ফেব্রুয়ারির মধ্য। তবে কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে তা মার্চ পর্যন্ত হয়ে থাকে।

টিউশন ফি

ফিনল্যান্ডে কোর্স থেকে ভেদে পড়তে আপনাকে খরচ করতে হবে ৮,০০০ থেকে ১০,০০০ ইউরো। এদেশে সাধারণত স্কলারশিপ প্রোগ্রাম বেশি নেই। এদেশে পড়ার জন্য সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ইরাসমাস মুন্ডাস।

বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি

সাধারণত মাস্টার্স কোর্সে পড়াশুনার জন্য বৃত্তি পাওয়া যায় না একমাত্র ইউরোপীয় ইরাসমাস বৃত্তি ছাড়া। সরাসরি ডক্টরাল কোর্সে পড়াশুনা করার জন্যও বৃত্তি পাওয়া বেশ কঠিন এবং তীব্র প্রতিযোগিতামূলক। কিন্তু এইখানে মাস্টার্স করার পর ডক্টরাল কোর্সের জন্য আবেদন করলে বৃত্তি পাওয়া অনেকটা সহজ হয়ে যায়।

খাওয়া-দাওয়া, আবাসন ও আনুসঙ্গিক খরচ

বৃত্তি না পাওয়া গেলে শুধু থাকা খাওয়ার খরচ নিজে ব্যবস্থা করতে পারলেই পড়াশুনা চালিয়ে নেয়া সম্ভব এখানে। প্রতি মাসে থাকা খাওয়ার জন্য গড়ে ৩৫০-৩৭০ ইউরো খরচ পড়ে। তবে শেয়ারে থাকলে খরচ অনেক কম পড়বে। সেক্ষেত্রে আবাসিক ভাড়া: ২২০-২৪০ ইউরো, খাওয়া খরচ: ৮০-৯০ ইউরো এবং আনুসঙ্গিক খরচ: ২০-৪০ ইউরোর মধ্যে রাখা যাবে। স্বাস্থ্যসেবার জন্য বাৎসরিক ২৫ থেকে ৭৫ ইউরো ব্যয় হতে পারে। এখরচের হিসেবটা আনুমানিক একজনের একা থাকার ক্ষেত্রে বিবেচ্য। তাছাড়া শহর ভেদে এ খরচ কম-বেশি হতে পারে।

এদেশে শিক্ষার্থীদের থাকার জন্য স্টুডেন্ট এপার্টমেন্ট আছে। সাধারণত শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই এধরণের আবাসনে বসবাস করে। আর স্টুডেন্ট এপার্টমেন্টগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের আশে পাশে হওয়াতে যাতায়াত খরচ অনেকটা কমে যায়। তবে এদেশে দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক যাতায়াত কার্ডের ব্যবস্থা রয়েছে। এগুলো অনেকটাই সাশ্রয়ী ও সবধরনের যানবাহনের জন্য ব্যবহার করা যায়।

খণ্ডকালীন চাকুরি ও আয়-রোজগারের সুযোগ-সুবিধা

ফিনল্যান্ডে ছাত্র হিসাবে থাকাকালে আপনাকে B Status-এ গণ্য করা হবে। এরপর চাকুরী শুরু করলে আপনাকে দেওয়া হবে A Status। আপনি যদি ৪ বছর A Status নিয়ে ফিনল্যান্ডে থাকেন তাহলেই আপনি বৈধ নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবেন। এজন্য আপনার ভাষাগত প্রমাণপত্র ও চাকুরীর প্রমাণপত্র দিয়েই স্থায়ী নাগরিক হিসেবে ফিনল্যান্ডে থাকতে পারবেন।

অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ফিনল্যান্ড বিশ্বের অন্যতম একটা সবল দেশ। সম্প্রতি বিশ্ব মন্দা কবলিত হলেও ফিনল্যান্ডে সার্বিক দিক দিয়ে এর প্রভাব অতটা ভয়াবহ নয়। আর এখন এদেশের অর্থনীতি কেবলই উন্নতির দিকে চলছে। এখানে শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে কাজ করার প্রচুর সুযোগ যা ইউরোপের যে কোন দেশের তুলনায় নিঃসন্দেহে অনেক ভাল। এখন পর্যন্ত কাজ কর্ম নিয়ে কেউ বড় ধরনের সমস্যায় পড়েছে বলে শোনা যায় নি। বরং সবাই আসার কয়েক মাসের মধ্যেই মোটামুটি একটা কাজ যোগাড় করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। কোথাও কোথাও শিক্ষার্থীদের সুবিধামত সময়ে খণ্ডকালীন কাজ করারও বিশেষ সুবিধা রয়েছে। সাধারণ সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা কাজের আইনি বৈধতা রয়েছে। আবার সামারে আর উন্টারে পাবেন ফুল টাইম টাইম কাজ করার সুযোগ। অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী এই দেশে কাজ করার রয়েছে বিপুল সুযোগ। আবার ২০-৫০ ক্রেডিট সম্পন্ন করার পর আপনি Teachers’ Assistant হিসেবে আবেদন করতে পারবেন। তবে পার্ট টাইম চাকুরী করতে আপনাকে সুইডিশ ভাষা জানা থাকলে পাবেন অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা। তবে চেনা পরিচিত লোকজন না থাকলে নতুন অবস্থায় এসে কাজ পেতে সমস্যা হয়। নূন্যতম ৬ মাসের খরচের অর্থ সঙ্গে নিয়ে এলে অনিশ্চয়তা অনেকটা কেটে যায়। কারণ তত দিনে একটা কাজ জুটে যায়।

খণ্ডকালীন কাজ সাধারনত ক্লিনিং কোম্পানিগুলোতেই হয়ে থাকে। তাছাড়া হোটেল কিংবা বাংলাদেশিদের ফাস্ট ফুডের দোকানে কাজ পাওয়া যায়। কারণ অন্যান্য কাজ পেতে হলে ফিনিস  কিংবা সুইডিস ভাষা জানা অপরিহার্য। তাছাড়া কমপিউটার বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তির শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে বিশেষ সুবিধা। ডেমলা (http://www.demola.fi) নামে একটা প্রতিষ্ঠান আছে, যেটি বিভিন্ন সফটওয়্যার কোম্পানি থেকে প্রজেক্ট নিয়ে শিক্ষার্থীদেরকে দিয়ে করিয়ে থাকে। অনেকটা স্বাধীনভাবে কাজ করার মত। আর এরকম কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারলে পরে তথ্য-প্রযুক্তির চুক্তিভিত্তিক, এমনকি স্থায়ী চাকরিও হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যারা বুদ্ধিমান তারা এ ধরনের কাজকে তাদের কোন একাডেমিক প্রজেক্ট হিসেবে নিয়েও ক্রেডিট নিতে পারে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

 

কমপিউটার ও তথ্য-প্রযুক্তির শিক্ষার্থীদের জন্য ফিনল্যান্ডে চাকরির বাজার অনেকটাই স্থিতিশীল। নকিয়া ছাড়াও অন্যান্য সফটওয়ার ফার্মে কাজ পাওয়ার ভাল সুযোগ আছে। প্রথম বছর হয়তো একটু কষ্ট হয়। কিন্তু কোর্সের নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্রেডিট সম্পন্ন করার পর কাজ পেলে কিংবা বৃত্তি পাওয়া গেলে তখন কোন চিন্তা থাকে না। আবার ৫০ থেকে ৬০ ক্রেডিট সম্পন্ন করার পর শিক্ষা সহযোগীর (Teaching Assistantship- TA) পদে খণ্ডকালীন কাজ করার জন্য আবেদন করা যায়। আর শিক্ষা সহযোগী  হতে পারলে মাস্টার্স থিসিস লেখার ও পরে ডক্টরেট করা জন্য বৃত্তির পথ অনেকটাই সুগম হয়ে যায়।

ভিসা নিয়ে যত কথা

ফিনিশ ভিসার জন্য আপনাকে যেতে হবে ইন্ডিয়া, কারণ ফিনল্যান্ডের এম্বেসী বাংলাদেশে নেই। এই দেশের ভিসা পেতে আপনার নিম্নোক্ত ডকুমেন্টস দরকার পড়বেঃ

১। পাসপোর্ট

২। ভিসা আবেদনের ফর্ম

৩। ভার্সিটির অফার লেটার

৪। পাসপোর্ট সাইজ রঙিন ছবি

৫। ব্যাংক স্ট্যাটমেন্ট

৬। ইনকাম এর উৎস

৭। টিউশন ফি পরিশোধের প্রমাণ

৮। ইন্স্যুরেন্স ও চাকুরির অভিজ্ঞতা (যদি থাকে)

আপনাকে ২ বছরের পারমিট এর জন্য আপনার নিজের একাউন্টসে ১৩,৪৪০ ইউরো দেখাতে হবে আর ১ বছরের পারমিট এর জন্য ৬৭২০ ইউরো দেখাতে হবে।

ফিনল্যান্ড ইউরোপের সমৃদ্ধ ও অপার সম্ভবনাময় এক দেশ। আপনি চাইলে নিজের সম্ভবনার খোঁজে আসতে পারেন ফিনল্যান্ডে।

আপনার মন্তব্য জানান